রোহিঙ্গা নিয়ে বাংলাদেশ আমাদের সঙ্গেও কথা বলুক: আরাকান আর্মি প্রধান

বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে, এটা আমাদের একটা অগ্রাধিকার। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশ আমাদের সঙ্গেও কথা বলুক।

সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি সংবাদমাধ্যমে মিয়ানমারের স্বাধীনতাকামী আরাকান আর্মির কমান্ডার ইন চিফ জেনারেল ওয়াং ম্রা নাইং বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্ক নিয়ে এসব কথা বলেন।

আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের বৃহত্তর স্বায়ত্তশাসনের জন্য লড়াই করছে। ২০০৯ সালের ১০ এপ্রিল আরাকান আর্মি প্রতিষ্ঠা হয় যার সৈন্য সংখ্যা বর্তমানে ২০ হাজার।

জেনারেল ওয়াং ম্রা নাইং বলেন, আমরা রোহিঙ্গাদের ‘রাখাইনের মুসলমান অধিবাসী’ বলে মানি। বাংলাদেশ আমাদের প্রতিবেশী। বাংলাদেশে আমি কোনো ভুল বোঝাবুঝির জন্ম দিতে চাই না। বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের খুব ভালো সম্পর্ক রাখতে হবে। এটা আমাদের একটা অগ্রাধিকার।

তিনি বলেন, শুধু অধিবাসী নয়, আমরা রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার স্বীকার করি। তবে এক কথায় এ সংকটের সমাধান নেই। বাংলাদেশ একার পক্ষেও এত বড় সমস্যা সমাধান করতে পারবে না। আমরাও এই ইস্যুতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করতে চাই। তবে সময় দরকার।

এ সংকটের বাংলাদেশকে একটি মাত্র ‘পক্ষ’। ১৯৫০-এর আগে ‘রোহিঙ্গা আইডেনটিটি’র কথা বিশেষ শোনা যায়নি। যখন শোনা গেল তার পেছনে একটি ইতিহাসও তুলে ধরা হলো। এখানে আরবের ইতিহাস আনা হলো। রাখাইনরা তখন ভাবল তাহলে আমাদের পূর্বপুরুষের ইতিহাস কোথায়?

এমনিতে আরাকানরা সব হারিয়ে ফেলেছে বার্মিজ প্রতিপক্ষের কাছে। শুধু ইতিহাসটুকু ছাড়া। ফলে তারাও ইতিহাসকে আঁকড়ে ধরে আছে প্রবলভাবে। রাখাইনদের মাঝে জাতীয়তাবাদী প্রবণতা আছে প্রবল। বিশ্বযুদ্ধের পর এভাবে আরাকানে প্রধান দুই জনগোষ্ঠীর মাঝে বিভেদ বেড়ে যায়। রাজনৈতিক কারণেই এসব ঘটে।

জেনারেল ওয়াং ম্রা নাইং বলেন, এখন আরাকান আর্মির দিক থেকে অবস্থান হলো, যেহেতু আমরা একক প্রতিপক্ষ হিসেবে বার্মিজদের বিরুদ্ধে, সে কারণে আরাকানে সবাইকে একসঙ্গে রাখতে চাই আমরা। এ সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশ বড় এক পক্ষ।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছি নানান সময়। প্রত্যাশিত সাড়া পেয়েছি বলতে পারব না। আমি চাই বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা আমাদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ–আলোচনা করুক। আমরা যথাযথ সাড়ার অপেক্ষা করছি।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে চীনের ভূমিকা সম্পর্কে জেনারেল নাইং জানান, চীন একটি বিশাল বিষয়। ইউনানের পাশে আমাদের কাছাকাছি অবস্থান। সেখানে সে দেশের নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ হয়, নীতি নির্ধারকদের সঙ্গে নয়। কখনো কখনো বাংলাদেশের সঙ্গে শরণার্থী সমস্যা নিয়ে তারা জানতে চেয়েছে।

জেনারেল ওয়াং ম্রা নাইং জানান, তারা এখন মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতিতে রয়েছে। আমরা আরাকান রাজ্যের শহরতলির কাছাকাছি রয়েছি।

যুদ্ধবিরতির আগে পরিস্থিতি খুবই খারাপ ছিল। এখন যে যুদ্ধবিরতি চলছে, সেটা সাময়িক। উভয় পক্ষে মাঝে কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক বা চুক্তি হয়নি। মাঝেমধ্যে কিছু ভার্চ্যুয়াল বৈঠক হয়।

তারা আমাদের প্রশাসন ও বিচারকাজ নিয়ে আপত্তি তোলে। এ মুহূর্ত যুদ্ধ বন্ধ থাকায় আমরা মূল মনোযোগ দিচ্ছি দখল করা এলাকায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার কাজে। বার্মার মিলিটারি খুবই নির্মম। তাদের আমরা কম সুযোগ দিতে চাই।

আরাকান আর্মির জেনারেল বলেন, পূর্বপুরুষের ভূমি পুনরুদ্ধারের জন্য আপাতত ৩০ থেকে ৫০ হাজার সৈনিক দরকার। আমরা স্বাধীনতা ঘোষণা করিনি। তবে পরোক্ষভাবে আমরা রাখাইন জনগণকে আমাদের রাজনৈতিক লক্ষ্যের কথা বলি। আমরা এ মুহূর্তের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিকে বিবেচনায় রাখছি।

১৯৭১-এ বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়েছিল। ভারতসহ অনেক দেশ তাকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এখন এ অঞ্চলে পরিস্থিতি আলাদা। আশপাশের শক্তিশালী দেশগুলো কেউ চাইছে না এ অঞ্চলে নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হোক। এ রকম রাষ্ট্র বেরিয়ে এলে শক্তিশালী দেশগুলোর ভয় হলো তাদের ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’রা উৎসাহিত হবে।

এদিকে বাংলাদেশ সরকার কোনোভাবেই চায় না আমরা তাদের সীমান্তের ভেতরকার কোনো বিষয়ে নাক গলাই। আমরা বাংলাদেশ সরকারের চাওয়াকে সম্মান জানাই।

আমরা বাংলাদেশের নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষকে বিরক্ত করতে ইচ্ছুক নই। দেশটির সঙ্গে ভালো সম্পর্ক গড়তে ইচ্ছুক। বিশেষভাবে চাই বাংলাদেশের মানুষ আমাদের সংগ্রাম সম্পর্কে প্রকৃত সত্য জানুক। আমাদের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে ভাবুক সেই সম্পর্ক হতে পারে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক সব ধরনের।