পাঁচ প্রতিষ্ঠানের প্রটোকল মেনে টিকার মেয়াদ বৃদ্ধি

দেশে করোনাভাইরাসের ফাইজার টিকার মেয়াদ বাড়ানোর আগে চারটি আন্তর্জাতিক এবং একটি দেশীয় প্রতিষ্ঠানের প্রটোকল অনুসরণ করা হয়েছে

ফলে টিকা প্রয়োগে কোনো ধরনের সমস্যা হবে না। তাছাড়া টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে সরবরাহের সময় নভেম্বর পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধির কথা জানিয়েছিল।

শনিবার কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনা টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য সচিব ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সদ্য সাবেক পরিচালক (মাতৃ, নবজাতক ও শিশুস্বাস্থ্য) মো. শামসুল হক যুগান্তরকে এ তথ্য জানিয়েছেন। শামসুল হক বলেন, টিকার মেয়াদ বৃদ্ধির ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডাব্লিউএইচও), ন্যাশনাল ইমিউনাইজেশন টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজারি কমিটির (নাইট্যাগ), ন্যাশনাল রেগুলেটরি অথরিটি (এনআরএ), যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) প্রটোকল অনুসরণ করা হয়েছে।

সবশেষ সরকারের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ) পর্যবেক্ষণে উত্তীর্ণ হওয়ার পর অনুমোদন দিয়েছে। ফাইজার টিকার শেলফ লাইফ বাড়ানোর জন্য ৯ থেকে ১২ মাস করা হয়েছে। এগুলো বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা হয়েই আসছে। আমরা (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর) নিজেরা বাড়াইনি। ফলে এ টিকা গ্রহণে সাধারণ মানুষের চিন্তিত হওয়ার কিছু নাই।

তিনি বলেন, মেয়াদ বাড়ানো ও প্রয়োগের আগে ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর (ডিজিডিএ) নভেম্বরের শেষ দিকে ট্রায়ালসহ সব পরীক্ষায় উত্তীর্ণের পরই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিষয়টি এক চিঠির মাধ্যমে দেশের সব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল, সব সিভিল সার্জন, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, জেলা ইপিআই সুপারিনটেনডেন্টকে জানানো হয়েছে। চি?ঠি?তে বলা হয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও উৎপাদনকারী সংস্থা ফাইজারের অনুমোদন ক্রমে ফাইজার কোভিড-১৯ টিকার মেয়াদ ৩০-১১-২০২২ থেকে ২৮-০২-২০২৩ খ্রি. পর্যন্ত বর্ধিত করা হয়েছে। ১ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়ে আজ ২৪ দিন হলো এই টিকা প্রয়োগ করা হচ্ছে। কোথায়ও কোনো সমস্যার কথা শোনা যায়নি। মেয়াদোত্তীর্ণ হলে অবশ্যই পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা যেত।

জানতে চাইলে ইপিআই টিকার প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. এস এম আব্দুল্লাহ আল মুরাদ যুগান্তরকে বলেন, ফাইজারের টিকার মেয়াদোত্তীর্ণের বিষয় নিয়ে টিকা বিষয়ক জাতীয় কারিগরি কমিটি ৫ সেপ্টেম্বর সভা করে। সভার কার্যবিবরণীতে টিকার মেয়াদ তিন মাস বৃদ্ধির অনুমোদন দেওয়া হয়। এছাড়া সরকারের ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর ১১ নভেম্বর স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিবকে লেখা চিঠিতে জানায়, ফাইজারের টিকার মেয়াদকাল ১২ মাস। তার তিনদিন পর ওই চিঠিতে বলা হয়, যেসব টিকার ভায়ালে মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ৩০ নভেম্বর ২০২২ সাল লেখা, সেসব টিকার বর্ধিত মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৩। আরও বলেন, এই টিকার মেয়াদ কতদিন হবে, ফাইজার টিকা উৎপাদন কোম্পানি ইমার্জেন্সি ইউজ অ্যাপ্রুভাল হিসাবে তা ঠিক করে দিয়েছে। আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর এর মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে। তাদের গবেষণায় টিকার মেয়াদ তিনমাস বৃদ্ধির বিষয়ে নিশ্চিত হয়ে তার তথ্য দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে। ডাব্লিউএইচও জানায়, তথ্য যাচাই করে ন্যাশনাল রেগুলেটরি অথরিটি (এনআরএ) যদি অনুমোদন দেয়, তবে টিকার মেয়াদ বাড়িয়ে ব্যবহার করা যাবে। ন্যাশনাল রেগুলেটরি অথরিটিও ফাইজারের তথ্য যাচাই করে জানিয়েছে, এটা বর্ধিত মেয়াদে ব্যবহার করা যাবে।

ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. সালাউদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও এনআরএ’র অনুমোদনের ভিত্তিতেই ফাইজারের টিকার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া এফডিএ এক চিঠিতে বলেছে, যেসব টিকার মেয়াদ ফুরিয়েছে, তার বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে। এতে তারা দেখেছে, মেয়াদ শেষ হওয়ায় টিকাগুলো তিন থেকে নয় মাস পর্যন্ত ব্যবহার করা যাবে, এতে কোনো ধরনের ক্ষতি হবে না। সব পর্যবেক্ষণ করে অনুমোদন দিয়েছি।

তবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাকোলজি বিভাগের একজন চিকিৎসক যুগান্তরকে বলেন, ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কোনো টিকার মেয়াদ বাড়ানোর নজির নেই। করোনার মতো ভয়ঙ্কর ভাইরাসের ক্ষেত্রে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে সংস্থার তিনটি কমিটি থাকে, তারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও পর্যালোচনা করে, তারপর এটি কতটা গ্রহণযোগ্য, সে বিষয়ে প্রতিবেদন দেয়। এসব প্রক্রিয়া শেষ করতে দীর্ঘ সময় লাগে। কিন্তু এত অল্প সময়ে কীভাবে অনুমোদন পেয়েছে, তা জানা নেই।

দেশে এখন পর্যন্ত সরকার অ্যাস্ট্রাজেনেকা, মডার্না, সিনোফার্ম, সিনোভ্যাক, জনসন অ্যান্ড জনসন ও ফাইজারের টিকা ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে ফাইজারের কিছু টিকা ছাড়া সবগুলোই মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার আগেই প্রয়োগ হয়েছে। ফাইজারের যেসব টিকার মেয়াদ ফুরিয়েছে, সেগুলোর মেয়াদ তিন মাস বাড়িয়ে দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। দে?শে অন্যান্য টিকার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের ফাইজারের তৈরি টিকাও দেওয়া হচ্ছে। ২০ ডিসেম্বর থেকে ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি, সম্মুখসারির কর্মীসহ বিশেষ জনগোষ্ঠীকে দেওয়া হচ্ছে টিকার চতুর্থ ডোজ।