টাকা ছাড়া কোন কাজ করেন না সাব রেজিস্ট্রার রিপন মুন্সি। টাকা হলে সব কিছুই করতে পারেন সাব রেজিস্ট্রার রিপন মুন্সি। বেআইনকে আইনে পরিণত করার কাজে সিদ্ধহস্ত এই সাব রেজিস্ট্রার। একই সামলাচ্ছেন দুই জেলার তিনটি সাব রেজিস্ট্রি অফিস। তিনটি অফিস থেকে প্রতি মাস লাখ লাখ টাকা ঘুষ হিসেবে উপরি আয় করে চলেছেন রিপন মুন্সি। এজন্য তিনি তার পচ্ছেন্দের লোক নিয়োজিত করেছেন। তিনি যেখানে যোগদান করেছেন সেখানেই সংবাদ শিরোন হয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সাব রেজিস্ট্রার রিপন মুন্সি ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলা সাব রেজিস্ট্রার। এর পাশাপাশি তিনি যশোর জেলার মণিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার অতিরিক্ত দায়িত্বে রয়েছেন। যশোর জেলার দুই উপজেলায় ঘুষ লেনদেনের বিষয়ে জেলা রেজিস্ট্রার আবু তালেব অবগত থাকলেও তিনি কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেন না। আবু তালেব নিজের ঘুষের অংক ঠিক রাখার জন্য সাব রেজিস্ট্রার রিপন মুন্সির বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেন না। জেলা রেজিস্ট্রার আবু তালেব যশোরে যোগদানের পর ঘুষ লেনদেনের অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছেন। জেলা রেজিস্ট্রার আবু তালেব ঘুষ আদায়ের জন্য মোহরার শামসুজামান মিলনকে দায়িত্ব দিয়ে রেখেছেন।
সূত্র জানায়, দলিল রেজিস্ট্রি হতে হলে সরকারের নির্ধারিত ফি এর পরিবর্তে তার নির্ধারিত অর্থ প্রদান করতে হয়। অন্যথায় সেবা প্রত্যাশীদের নানাভাবে হয়রানি করা হয়। একটি সাফ কবলা দলিল লাখে দেড় হাজার টাকা, পরবর্তী ১০ লাখ পর্যন্ত প্রতি লাখে ৫০০ টাকা, দশ লাখের ঊর্ধ্বে হলে প্রতি লাখে ৪০০ টাকা এবং দলিল মূল্য এক কোটির ঊর্ধ্বে হলে আলোচনার মাধ্যমে রেট ঠিক করা হয়। ওয়ারেশ সম্পত্তি হলে মাথাপ্রতি ৩ থেকে ৫ হাজার টাকা ঘুষ নেন। দানপত্র, হেবাবিল, এওয়াজ বদল, বন্টননামা, না-দাবি দলিলসহ সকল প্রকার দলিল রেজিস্ট্রিতে তার রেট অনুযায়ী অর্থ দিতে না পারলে দলিল রেজিস্ট্রি হয় না। এ সকল দলিলের ক্ষেত্রে তিনি আট হাজার টাকা থেকে বিশ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেন। তবে দলিলে দাতা বা গ্রহীতা অথবা জমির কোন সমস্যা থাকলে ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেন।
হিন্দুদের জমি রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে ঘুষের অর্থ আদায়ের জন্য তিনি বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। হিন্দুরা জমি বিক্রয় করে ভারতে চলে যায় বলে তিনি হিন্দুদের জমি রেজিস্ট্রিতে প্রাথমিকভাবে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট দলিল লেখকের মাধ্যমে দাতা ও গ্রহীতাকে তার কামরায় ডেকে এনে একান্তে কথা বলেন। তিনি সীমান্ত এলাকায় হিন্দুদের জমি রেজিস্ট্রিতে কর্তৃপক্ষের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে মর্মে দাতাকে বিভিন্নভাবে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করেন। প্রতিটি হিন্দু জমি রেজিস্ট্রেশনে তিনি দুই লক্ষ থেকে দশ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঘুষ গ্রহণ করেন। সাব রেজিস্ট্রার রিপন মুন্সি কমিশন দলির প্রতি সর্বনিন্ম এক থেকে চার লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নিয়ে থাকেন। নকল প্রতি ২শ’ টাকা ঘুষ নেন। এছাড়া দলিল লেখকদের লাইসেন্স নাবায়ন বাবদ মোটা অংকের ঘুষ নিয়ে থাকেন।
সূত্র জানায়, সাব রেজিস্ট্রার রিপন মুন্সি রোব ও সোমবার যশোরের মনিরামপুর উপজেলায় দায়িত্ব পালন করেন। মঙ্গলবার একই জেলার কেশবপুরউপজেলায় দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া বুধ ও বৃহস্পতিবার নিজ কর্মস্থল কালীগঞ্জে অফিস করেন। কালীগঞ্জে তার ঘুষের টাকা উঠানোর দায়িত্ব পালন করেন ফ্যাস্টিট আওয়ামী লীগের মেম্বার নকল নবিশ সাহেব আলী। এছাড়া মণিরামপুরে ঘুষের টাকা আদায়ের জন্য মোহরার শরীফ এবং কেশবপুরে রয়েছে ওমেদার মোদন।
সূত্র জানায়, ঝিনাইদহ কালীগঞ্জে সাব রেজিস্ট্রি অফিসের দলিল লেখকদের লাইসেন্স নবায়নে ব্যাপক অনিয়ম স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ রয়েছে সাব রেজিস্টার রিপন মুন্সির বিরুদ্ধে। সরকারি নিয়মকে পাশ কাটিয়ে লাইসেন্স নবায়ন করে মোটা অংকের আর্থিক সুবিধা গ্রহন করেছেন তিনি।
বিগত সরকারের আমলে রেজিস্ট্রি অফিস নিয়ন্ত্রনকারী রাঘোবোয়াল সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন চৌধুরী, তার ভাই আহাদ আলী, ভাইরাভাই কামাল হোসেন, সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান শফিকুজ্জামান রাসেল, রবিউল ইসলাম মিন্টুসহ বেশ কয়েকজন লেখক দীর্ঘদিন বিভিন্ন মামলার বোঝা মাথায় নিয়ে আত্মগোপনে রয়েছে। এমনকি তাদের নামে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি রয়েছে। সরকারি নিয়ম মোতাবেক দলিল লেখকদের লাইসেন্স প্রতি বছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে নির্ধারিত সরকারি ফি ব্যাংকে জমা দিয়ে নবায়ন করার কথা থাকলেও লেখকদের লাইসেন্স নবায়নের জন্য জেলা রেজিস্ট্রার এর খরচ বাবদ লাইসেন্স প্রতি ৩ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সাব রেজিস্টারের বিরুদ্ধে।
অপরদিকে, সরকারি নিয়ম মোতাবেক একজন লেখকের লাইসেন্সে বছরে ৩০০ দলিল রেজিস্ট্রি না হলে ওই লাইসেন্স বাতিলের বিধান থাকলেও কালীগঞ্জ সাব রেজিস্টার এ আইন মানেননি। সরকারি নিয়ম অনুযায়ি অত্র অফিসে ১৮ থেকে ২০ টি দলিল লেখক লাইসেন্স চলমান থাকার কথা। কিন্তু সাব রেজিস্টার অর্থনৈতিক সুবিধা হাসিলের জন্য ৮০ জন দলিল লেখক রয়েছে। বিগত সরকারের আমলে বহুল আলোচিত দুদকসহ বিভিন্ন মামলার পলাতক আসামি নাসির চৌধুরীরসহ একাধিক দলিল লেখক বিগত দিনে সাবেক সংসদ সদস্য আব্দুল মান্নান ও আনোয়ারুল আজিম আনারের খুটির জোরে ধরাকে সরা জ্ঞান করে রাম রাজত্ব কায়েম করেছিল। রেজিস্ট্রির ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফি থেকেও তিন থেকে সাত গুণ অর্থ জোরপূর্বক আদায় করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল নাসির চৌধুরীর সিন্ডিকেট। যার দরুন নাসির চৌধুরী শত কোটি টাকার মালিক বনে যাই অল্প সময়ে। সেই দলিল লেখক নাসির চৌধুরীর গংদের লাইসেন্স নবায়নে দায়িত্ব পালন করছেন সাব রেজিস্টার রিপন মুন্সি। তলে তলে তাদের সাথে রিপন মুন্সির রয়েছে গোপন সখ্যতা।
একাধিক লেখক জানান, বর্তমানে সাব রেজিস্টার রিপন মুন্সি নাসিরের ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। বর্তমানে কবলা দলিলের পরিবর্তে দানপত্র দলিল করে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়েমোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। অফিসের মধ্যে ঘুষের টাকা রাখতে ব্যবহার করছেন রেকর্ডরুম।
এর আগে ২০২২ সালে যশোরের মনিরামপুরে সাবরেজিস্ট্রার হিসাবে দায়িত্ব পালনের সময় রিপন মুন্সির বিরুদ্ধে ঘুস নিয়ে ভারতীয় নাগরিক শৈলন্দ্রনাথ মণ্ডলের জমির দলিল রেজিস্ট্রির অভিযোগ উঠে। শৈলন্দ্রনাথ প্রায় ৩৫ বছর ধরে ভারতে বসবাস করছেন। কয়েক যুগ ভোটার তালিকায় নাম নেই। ছিলো না জাতীয় পরিচয়পত্র। তারপরও শুধু জন্মসনদ দিয়েই শৈলন্দ্রনাথ ৮০.৫০ শতাংশ জমি বিক্রি করেন। যার সমুদয় অর্থ অবৈধ পন্থায় ভারতে পাচার করেছেন।
সাতক্ষীরায় দায়িত্ব পালন কালে শামীমা আক্তার দীপা নামে এক নারীর সঙ্গে তার অনৈতিক বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক ছিল। যা পুরো সাতক্ষীরাবাসীর মুখে মুখে আলোচনায় ছিল। তিনি ২০২৪ সালের ২৬ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত চিকিৎসার জন্য ভারতে অবস্থানকালীন সময় নিজ স্ত্রীকে সফর সঙ্গী না করে, শামীমা আক্তার দীপা নামে ওই নকলনবিশকে সফরসঙ্গী করেন। দীপা ছাড়াও তিনি একাধিক নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে বলে সাতক্ষীরার মানুষরা জানায়। এছাড়া নৈশপ্রহরী জাহিদ সাব রেজিস্ট্রিার রিপন মুন্সিকে নারী ও মদ সরবরাহ করে থাকে বলে অভিযোগ ছিল।
এ ব্যাপারে সাব রেজিস্টার রিপন মুন্সির মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, নাসির চৌধুরীর আবেদন খালি রেখে ঝিনাইদহ জেলায় পাঠানো হয়েছে। নবায়নকারী ঝিনাইদহ জেলা রেজিস্টার স্যার,আমি না। নাসির চৌধুরীর সহ দলিল লেখকদের আবেদন আপনি কিভাবে হাতে পেলেন এমন প্রশ্নের কোন সদুত্তর তিনি দেননি। নবায়নে জন্য দলিল প্রতি তিন হাজার টাকা অতিরিক্ত নেওয়ার কথাও অস্বীকার করেন তিনি। আমার অফিসে কোনো সিন্ডিকেট নেয়,সরকারি ফির অতিরিক্ত কোনো টাকা নেওয়ার হয় না বলেও তিনি বলেন।







