জঙ্গী মদতের যে সব অভিযোগকে ঘিরে ফের সংঘাতে ভারত-পাকিস্তান

pakistan

আফগানিস্তানের ভূখন্ডকে ব্যবহার করে ভারত তাদের দেশের ভেতর সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে মদত দিচ্ছে, পাকিস্তান অনুষ্ঠানিকভাবে এই অভিযোগ তোলার পর ভারত তা সরাসরি ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে।

গত শনিবার রাতেই পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সেনা মুখপাত্র যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে বহু নথিপত্র পেশ করে জানিয়েছিলেন, ভারতের বিরুদ্ধে এই সব সাক্ষ্যপ্রমাণ তারা জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক বিশ্বের কাছে তুলে ধরবেন।

জবাবে ভারত শুধু সেই অভিযোগ খন্ডনই করছে না, ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এদিন আন্ত:-সীমান্ত সন্ত্রাসবাদের জন্য পাল্টা পাকিস্তানকেই দুষেছেন।

কাবুলে আফগান সরকারও ইতিমধ্যে পাকিস্তানের তোলা অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে।

বস্তুত মুম্বাইতে এক যুগ আগের সন্ত্রাসবাদী হামলাই হোক কিংবা সম্প্রতি উরি বা পুলওয়ামাতে সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আক্রমণের ঘটনা – ভারতই এতকাল এসবের পেছনে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই ও পাকিস্তান-ভিত্তিক নানা সংগঠনকে দায়ী করে নানা নথিপত্র পেশ করে এসেছে।

কিন্তু গত শনিবার রাতে পাকিস্তানও প্রথমবারের মতো সেই পথে হেঁটেছে।

সে দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শাহ মাহমুদ কুরেশি ও প্রধান সেনা মুখপাত্র মেজর জেনারেল বাবর ইফতিকার এক ঘন্টার এক দীর্ঘ সাংবাদিক সম্মেলনে দাবি করলেন, বালোচিস্তান থেকে খাইবার-পাখতুনখোয়া কিংবা গিলগিট-বালটিস্তানে ইদানীং কালে যে সব জঙ্গী হামলা হয়েছে তার সবগুলোর পেছনে ভারতের হাত আছে।

এই দাবির সমর্থনে তারা একটি ডসিয়ের বা সাক্ষ্যপ্রমাণের সংকলনও পেশ করেছেন।

মি কুরেশি ওই সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “ভারত এতদিন পাকিস্তান-বিরোধী কার্যকলাপের জন্য নিজেদের ভূখন্ডকেই ব্যবহার করছিল, কিন্তু এখন আফগানিস্তান-সহ আশেপাশে যেখানেই তারা স্পেস পাচ্ছে সেটাকেও কাজে লাগাচ্ছে।”

“ভারতের ‘র’ ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের যোগসাজশের এই যে সব অকাট্য প্রমাণ আমরা পেয়েছি, এগুলো এখন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরা হবে।”

পাকিস্তানি আইএসপিআরের মহাপরিচালক বাবর ইফতিকার দাবি করেন, তাদের দেশে প্রতিটি আত্মঘাতী হামলার জন্য ভারত হামলাকারীদের এক কোটি রুপি করে দিচ্ছে।

সেই সঙ্গে কাবুল, কান্দাহার ও জালালাবাদের ভারতীয় দূতাবাস থেকে মদত দেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন জঙ্গী গোষ্ঠীকে। কথিত র এজেন্টদের কথোপকথনের কয়েকটি অডিও ফাইলও বাজিয়ে শোনানো হয়।

মেজর জেনারেল ইফতিকার আফগানিস্তানের দারি ভাষায় লেখা একটি চিঠির প্রতিলিপি দেখিয়ে দাবি করেন, “পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলা চালানোর জন্য ভারত তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান বা টিটিপি নেতৃত্বকে সোয়া আট লক্ষ ডলার দিয়েছে।”

“চীন-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডরে অন্তর্ঘাত চালানোর জন্য বালোচিস্তানে তারা গড়ে তুলেছে সাতশো সদস্যের এক মিলিশিয়া বাহিনী।”

“জঙ্গী কার্যকলাপে মদত দেওয়ার জন্য চব্বিশজনকে নিয়ে একটি কমিশনও তৈরি করা হয়েছে – যার মধ্যে দশজনই র’-এর গোয়েন্দা এবং এর জন্য ছয় কোটি ডলারের বাজেটও বরাদ্দ করা হয়েছে।”

এর চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই পাল্টা বিবৃতি দিয়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অনুরাগ শ্রীবাস্তব বলেন, পাকিস্তানের এই সব কথাবার্তা ‘ভারত-বিরোধী প্রোপাগান্ডা চালানোর ব্যর্থ চেষ্টা’ ছাড়া আর কিছুই নয়।

এই সব ‘ভিত্তিহীন ও কাল্পনিক অভিযোগ’ দুনিয়ায় কেউ বিশ্বাস করবে না বলে মন্তব্য করে তিনি আরও দাবি করেন, দেশের ভেতরে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা থেকে নজর ঘোরাতেই পাকিস্তান এ সব করছে।

পাকিস্তানের তোলা সব অভিযোগ অস্বীকার করে এরই মধ্যে বিবৃতি দেয় আফগান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও।

এরপর আজ সোমবার ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর তার ‘ডেকান ডায়ালগ’ ভাষণে বলেন, রাষ্ট্রীয় মদতে সীমা-পারের সন্ত্রাসবাদের জন্য কারা আসলে দায়ী সেটা সারা দুনিয়াই জানে।

মি জয়শঙ্কর বলেন, “এর দৃষ্টান্ত আমাদের ঘরের দোরগোড়াতেই আছে – আর সারা বিশ্বও সেটার প্রকৃতি সম্বন্ধে আজ অবহিত।”

“সন্ত্রাসে অর্থায়ন, র‍্যাডিক্যালাইজেশন বা সাইবার রিক্রুটমেন্টের মাধ্যমে কীভাবে এটা করা হচ্ছে, সেটাকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখতে আমরা নিরন্তর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।”

এই পাল্টাপাল্টি দোষারোপের পটভূমিতেই পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এ সপ্তাহেই আফগানিস্তানে যাচ্ছেন – দুবছর আগে ক্ষমতায় আসার পর যেটা হবে কাবুলে তার প্রথম সফর।

এরই মধ্যে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীরের নিয়ন্ত্রণরেখায় শুক্রবার থেকে দুপক্ষের তীব্র গোলাবর্ষণের মধ্যেই দুদেশের মধ্যে উত্তেজনা আবার চরমে পৌঁছেছে।

গোলাবর্ষণে দুদিকেই সেনা সদস্য ও বেসামরিক ব্যক্তিরা প্রাণ হারিয়েছেন, দুপক্ষই দিল্লি ও ইসলামাবাদে অন্য পক্ষের সর্বোচ্চ কূটনীতিবিদকে তলব করে তাদের প্রতিবাদও জানিয়েছে।