রেলে কেনাকাটায় অনিয়মের তদন্ত প্রতিবেদন উপেক্ষা করছে মন্ত্রণালয়

কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগের তদন্ত শেষে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কমিটি বাংলাদেশ রেলওয়ের ২১ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। কিন্তু, মন্ত্রণালয় সেই সুপারিশ উপেক্ষা করে ওই ২১ কর্মকর্তার মধ্যে একজনকে উল্টো পদোন্নতি দিয়েছে। চলছে আরও একজনকে পদোন্নতি দেওয়ার প্রক্রিয়াও।

ওই তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে প্রায় তিন মাস আগে। এর মধ্যে একজন ছাড়া বাকি ২০ জনের কেউই কোনো ধরনের বিভাগীয় ব্যবস্থার মুখোমুখি হওয়া ছাড়াই স্বাভাবিকভাবে তাদের স্ব-পদে বহাল তবিয়তে কাজ করে যাচ্ছেন।

এক কর্মকর্তাকে ভিন্ন অভিযোগে গত বছর বরখাস্ত করা হয়েছিল।

গত বছরের ২৫ আগস্ট তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে রেলপথ মন্ত্রণালয়। তদন্তে দেখা গেছে, করোনা মোকাবিলায় সুরক্ষা সামগ্রী কেনায় অনিয়ম হয়েছে এবং কর্মকর্তারা এর সঙ্গে জড়িত। এমনকি দরপত্রের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই অনেক জিনিস কিনে ফেলা হয়েছে।

গত বছরের ৫ নভেম্বর জমা দেওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে কমিটি এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে যেকোনো ধরনের কেনাকাটার প্রক্রিয়ায় তাদের না রাখার সুপারিশও করা হয়েছে।

ওই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার এক মাস পর অতিরিক্ত মহাপরিচালক সরদার শাহাদাত আলীকে উল্টো পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের সুপারিশ মেনে আরেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মনজুর-উল-আলম চৌধুরীকে পদোন্নতি দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে মন্ত্রণালয়।

নথি অনুসারে, তদন্ত প্রতিবেদনে অনিয়মের সঙ্গে জড়িত থাকাদের তালিকায় নাম থাকা সত্ত্বেও প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক রুহুল কাদের আজাদ ও আরও তিন জনকে রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থার জন্য বিভিন্ন জিনিস কেনাকাটার প্রক্রিয়ার সঙ্গেই রাখা হয়েছে।

করোনা মোকাবিলায় গত বছরের মার্চের শেষের দিকে যখন দেশব্যাপী শাটডাউন ঘোষণা করা হলো, তখন যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচলও বন্ধ রাখে বাংলাদেশ রেলওয়ে। তবে, পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে মালবাহী ট্রেন তারা চালু রেখেছিল। বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়েতে ২৫ হাজার কর্মী রয়েছে।

তদন্তে পাওয়া তথ্য

বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের জন্য দরপত্র প্রক্রিয়া ছাড়াই কোভিড-১৯ প্রতিরোধমূলক সুরক্ষা সরঞ্জাম কেনা এবং সেগুলো নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি মূল্যে কেনা নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর যুগ্মসচিব ফয়জুর রহমান ফারুকিকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে রেলপথ মন্ত্রণালয়। কমিটির বাকি দুই সদস্য হলেন— যুগ্ম মহাপরিচালক (প্রকৌশল) শহীদুল ইসলাম ও মন্ত্রণালয়ের উপসচিব নাজমুল হক।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন বিভাগের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে কয়েকজন ঠিকাদারের কাছ থেকে চার কোটি ৬৫ লাখ টাকার জিনিসপত্র কেনা হয়েছিল।

কেনাকাটায় অনিয়মের সঙ্গে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ২১ কর্মকর্তা জড়িত বলে উল্লেখ করে ‘সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে’ মর্মে সুপারিশ করা হয়েছিল প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ‘পত্রিকায় প্রকাশিত অভিযোগ যেমন সত্য, তেমন উচ্চমূল্যে জিনিসপত্র কেনার বিষয়টিও প্রমাণিত।’

সেখানে বলা হয়েছে, যেহেতু দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে সব চাহিদা এসেছে, তাই একটি দরপত্রের আওতায় প্রয়োজনীয় সব কেনা যেত। কিন্তু, উচ্চপর্যায় থেকে যাতে অনুমতি নিতে না হয়, তাই তারা ছোট ছোট চালানে আলাদা দরপত্রের মাধ্যমে কেনাকাটা করেছে।

প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক সর্বোচ্চ ৩০ লাখ ও অতিরিক্ত মহাপরিচালক ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ক্রয়ের অনুমোদন দিতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাহিদাপত্রের পরিপ্রেক্ষিতেই ‘কিছু কিছু ক্ষেত্রে’ দরপত্র আহ্বানের পূর্বেই সরবরাহকারীদের কাছ থেকে মালপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে।

তদন্ত কমিটির অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাজারদর যাচাইকারীদের বাজারদরে অর্থাৎ প্রতিটি জিনিসের অধিক একক মূল্য দেখেও দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির মূল্যায়ন সম্পর্কে মন্তব্য ‘বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ’ উল্লেখ করা যৌক্তিক মর্মে বিবেচিত হয় না।

মনজুর, শাহাদাত আলী ও রুহুল কাদের— এই তিন কর্মকর্তা বাজারদর অনুমোদন করেছেন। আর শাহাদাত, রুহুল ও বেলাল— এই তিন জন দরপত্র অনুমোদনকারীদের মধ্যে ছিলেন। আর অন্যান্য কর্মকর্তারা কেনাকাটার বিভিন্ন ধাপের সঙ্গে জড়িত ছিলেন।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন অফিস একই জিনিস ভিন্ন দামে কিনেছে। উদাহরণস্বরূপ: কেএন-৯৫ মাস্ক সিসিএস অফিস কিনেছে প্রতিটি ৭২৭ টাকা দরে, সিওএস (পূর্ব) অফিস কিনেছে ৩৫১ টাকা দরে ও সিএমই (পূর্ব) অফিস কিনেছে ২৫০ টাকা দরে। একইভাবে এক লিটার বোতলের স্যাভলন সিসিএস অফিস কিনেছে প্রতিটি ৪৪২ টাকা দরে, সিওএস (পূর্ব) অফিস কিনেছে ৬৪৭ টাকা দরে ও সিএমই (পূর্ব) অফিস কিনেছে ৭৫০ টাকা দরে।

পদোন্নতি, কেনাকাটার প্রক্রিয়ায় বহাল

গত বছরের মার্চ ও জুলাইয়ের মধ্যবর্তী সময়ে যখন কেনাকাটার প্রক্রিয়া চলছিল, তখন শাহাদাত আলী বাংলাদেশ রেলের জেনারেল ম্যানেজার (পূর্ব) ও মনজুর-উল-আলম অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) ছিলেন।

গত বছরের ৬ ডিসেম্বর শাহাদাত আলীকে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।

যদিও তারা তখনো গ্রেড-৩’র কর্মকর্তা ছিলেন, তবে জিএম ও এডিজি এই দুইটি পদই গ্রেড-২ মর্যাদার এবং তারা চলতি দায়িত্ব হিসেবে গ্রেড-২’র পদের দায়িত্ব পালন করছিলেন।

গত ২৪ ডিসেম্বর সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড এই দুই জনকে পদোন্নতি দেওয়ার সুপারিশ করেছে এবং ২৭ ডিসেম্বর রেল মন্ত্রণালয় শাহাদাতকে পদোন্নতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে।

কিন্তু, মনজুরের ফিডার পদে চাকরির মেয়াদ তিন বছর পূর্ণ না হওয়ায় তাকে পদোন্নতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করতে পারেনি মন্ত্রণালয়। তিন বছর পূর্ণ না হলে পদোন্নতি দেওয়ার বিধান নেই।

বাংলাদেশ রেলওয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, মনজুরকে যাতে গ্রেড-২ এ পদোন্নতি দেওয়া যায়, সেজন্য তিন বছর পূর্ণ হওয়ার বিধানটি প্রমার্জনার জন্য মন্ত্রণালয় রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেছে। বিষয়টি এখনো প্রক্রিয়াধীন।

তদন্ত কমিটি ওই ২১ কর্মকর্তাকে ভবিষ্যতে কোনো ধরনের সরকারি ক্রয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করা থেকে বিরত রাখার সুপারিশ করলেও তাদের মধ্যে চার জন এখনো এই প্রক্রিয়ার সঙ্গেই রয়েছেন।

চলতি বছরের ১৭ জানুয়ারি ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের ডিজেল বৈদ্যুতিক মাল্টিপল ইউনিটের (ডিইএমইউ) জন্য খুচরা যন্ত্রাংশ সংগ্রহে যোগ্য ও সম্ভাব্য দরপত্রদাতা নির্বাচন ও অনুমোদনের জন্য একটি নথি’তে সই করেছেন রুহুল কাদের।

গত ২ ডিসেম্বর থেকে ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়ে ক্রয় সংক্রান্ত আরও তিনটি নথিতে তিনি সই করেছেন।

ওই ২১ কর্মকর্তার মধ্যে দরপত্র প্রক্রিয়ার সঙ্গে ছিলেন বেলাল হোসেন ও দুই জন সহকারী সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক। বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের স্টোরের নিয়ন্ত্রক হিসেবে গত ৮ ডিসেম্বর একটি দরপত্রে সই করেছেন বেলাল।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলে কর্মরত অবস্থায় রেলের কেনাকাটায় অনিয়মের সঙ্গে বেলালের জড়িত থাকার প্রমাণ আরেক তদন্ত কমিটি পাওয়ার পর গত ২৯ ডিসেম্বর মন্ত্রণালয় তাকে বরখাস্ত করেছে।

গত ৩ ফেব্রুয়ারি মনজুরের মন্তব্য জানতে তার অফিসে যান প্রতিবেদক। কিন্তু, মনজুর তার সঙ্গে দেখা করতে রাজি হননি।

সরদার শাহাদাত আলী জানান, এ ধরনের অভিযোগের বিষয়ে তিনি অবগত নন।

‘যদি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে আমার নাম থাকে এবং কর্তৃপক্ষ যদি আমার কাছে ব্যাখ্যা জানতে চায়, তাহলে আমি এ বিষয়ে বক্তব্য দেবো’, গত ১০ ফেব্রুয়ারি রেলভবন কার্যালয়ে তিনি এ কথা বলেন।

তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে উল্লেখ করলে তিনি বলেন, ‘আমাকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে জানানো হয়নি। তাই আমি এ বিষয়ে কোনো কথা বলব না।’

মুঠোফোনে রুহুল কাদের আজাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ক্ষুদেবার্তা পাঠালেও তিনি সেটির জবাব দেননি। যোগাযোগ করা যায়নি বেলালের সঙ্গেও।

গত ৩ ফেব্রুয়ারি যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনও।

অভিযোগগুলোকে ‘তুচ্ছ’ হিসেবে উল্লেখ করার চেষ্টা করে রেলমন্ত্রী জানান, তদন্ত প্রতিবেদনটি তিনি বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের কাছে পাঠিয়েছেন। তার মতামত পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘রেলওয়েতে কলিউসিভ করাপশন কতটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছে, এটি তার একটি দৃষ্টান্ত।’

গত ৮ ফেব্রুয়ারি তিনি বলেন, ‘তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরও ব্যবস্থা না নিয়ে উল্টো পদোন্নতি দেওয়ার মাধ্যমেই বোঝা যায় যে, রেলওয়েতে দুর্নীতি কতটা গভীরভাবে প্রথিত।’

‘এই পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, রেলওয়ের উচ্চ পর্যায়ের লোকেরাও এসব দুর্নীতি-অনিয়মের সঙ্গে জড়িত কি না’, বলেন তিনি।

সূত্র : ডেইলি স্টার