পশ্চিমবঙ্গে মমতার ভূমিধস জয়

momota election

একা লড়াই করেই ইতিহাস গড়লেন পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জিতে তৃতীয়বারের জন্য বাংলার মসনদে আসীন হচ্ছেন তিনি।

২০২১ এর বিধানসভার নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল তৃণমূলের ওপরই ভরসা রাখল রাজ্যের মানুষ। যদিও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পর মমতা ব্যানার্জির নিজ আসন নন্দীগ্রামে প্রতিদ্ব›দ্বী প্রার্থী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে গেছেন। অবশ্য নির্বাচন কমিশন ভোট পুনর্গণনার চিন্তা করছে।

অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গে বিরোধী দলের মর্যাদা পেতে চলেছে বিজেপি। যদিও ২০১৬ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করা মাত্র ৩টি আসন থেকে একুশের নির্বাচনে অনেকটা উল্কার মতো উত্থান হয়েছে কিন্তু সরকার গড়ার ধারেকাছে পৌঁছতে পারেনি গেরুয়া শিবির। অন্যদিকে আশা জাগিয়েও বাম-কংগ্রেস-ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্টের জোট সংযুক্ত মোর্চা কোনো ছাপই ফেলতে পারেনি এবারের নির্বাচনে। জয়ের ঝড়ে কার্যত খড়কুটোর মতো উড়ে গেল জোটের প্রার্থীরা।

আট দফায় রাজ্য বিধানসভার নির্বাচনে ২৯৪টি আসনের মধ্যে ভোট গ্রহণ হয়েছে ২৯২টি আসনে (সামশেরগঞ্জ ও জঙ্গিপুর কেন্দ্র দুটিতে প্রার্থী মৃত্যুর কারণে ভোট স্থগিত রাখা হয়েছে)। প্রথম দফার ভোট হয় ২৭ মার্চ, শেষ দফার ভোট গ্রহণ হয় ২৯ এপ্রিল। রবিবার (২ মে) ছিল ভোট গণনা। রাজ্যে সরকার গড়তে দরকার ১৪৭টি আসন। সেখানে ২০৯টি আসনে এগিয়ে আছে তৃণমূল কংগ্রেস। ২০১৬ সালের নির্বাচনে ২১১টি আসন পেয়ে দ্বিতীয়বারের জন্য রাজ্যে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস। একুশের নির্বাচনেও প্রায় সেই সংখ্যার কাছাকাছি পৌঁছে গেছে তৃণমূল। অন্যদিকে ৮০টি আসনে এগিয়ে আছে বিজেপি, ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মাত্র ৩টি আসন পেয়েছিল তারা।

অন্যদিকে সংযুক্ত মোর্চার (বাম-কংগ্রেস-ইন্ডিয়া সেকুলার ফ্রন্ট) প্রার্থীদের মাত্র ১টি আসনেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো। শেষ নির্বাচনে বাম-কংগ্রেসের জোট পেয়েছিল ৭০টি আসন, সেখানে আইএসএফকে সঙ্গে নিয়েও কার্যত সাফ হয়ে গেল বাম-কংগ্রেস।

এবারের নির্বাচনে মমতা রাজনীতিতে আনকোড়া একাধিক নতুন মুখ, সেলিব্রেটি প্রার্থীদেরও জিতিয়ে এনেছেন। একাধিক আসনে গতবারের চেয়ে এবারের জয়ের ব্যবধানও বাড়িয়েছেন তৃণমূলের প্রার্থীরা। এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে হাইভোল্টেজ কেন্দ্র ছিল নন্দীগ্রাম, দেশ-বিদেশের গণমাধ্যমের নজরও ছিল এখানে। কারণ নিজের নির্বাচনী কেন্দ্র কলকাতার ‘ভবানীপুর’ ছেড়ে এবার পূর্ব মেদিনীপুর জেলার ‘নন্দীগ্রাম’ কেন্দ্রে লড়াই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মমতা। এই কেন্দ্রে মমতার প্রধান প্রতিপক্ষ ছিলেন বিজেপির প্রার্থী রাজ্যের সাবেক মন্ত্রী ও নন্দীগ্রামের ভূমিপুত্র শুভেন্দু অধিকারী। সকাল থেকেই প্রথম কয়েক রাউন্ডের গণনায় এগিয়ে ছিলেন শুভেন্দু, কিন্তু বেলা গড়াতেই কখনো শুভেন্দু কখনো মমতা এগিয়ে যেতে থাকেন। ১৭ রাউন্ড ভোট গণনার পর সেখানে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জয়ী হয়েছেন বলে খবর আসছিল।

কিন্তু সন্ধ্যা গড়াতে মমতার জয় নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। বলা হয়, সার্ভারে সমস্যার জেরে সঠিকভাবে কিছু জানা যাচ্ছে না। তৈরি হয় ভোট গণনা ঘিরে বিভ্রান্তি। নতুন করে গণনা হতে পারে। এ ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন রিটার্নিং অফিসার। তৃণমূলের জয়ী প্রার্থীদের মধ্যে অন্যতম হলেন- ভবানীপুর কেন্দ্রে মন্ত্রী শোভনদেব ভট্টাচার্য, কসবা কেন্দ্রে মন্ত্রী জাভেদ আহমেদ খান, কলকাতা বন্দর কেন্দ্রে মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, বেহালা পূর্ব কেন্দ্রে মন্ত্রী পার্থ চ্যাটার্জি, টালিগঞ্জ কেন্দ্রে মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস, হাবড়া কেন্দ্রে মন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, বালিগঞ্জ কেন্দ্রে মন্ত্রী সুব্রত মুখার্জি, দমদম কেন্দ্রে ব্রাত্য বসু, দমদম উত্তর কেন্দ্রে চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, বিধাননগর কেন্দ্রে এগিয়ে রাজ্যের মন্ত্রী সুজিত বসু, বরানগর কেন্দ্রে মন্ত্রী তাপস রায় প্রমুখ।

এ ছাড়াও সেলিব্রেটি প্রার্থীদের মধ্যে আছেন উত্তরপাড়া কেন্দ্রে অভিনেতা কাঞ্চন মল্লিক, ব্যারাকপুর কেন্দ্রে পরিচালক রাজ চক্রবর্তী, রাজারহাট-গোপালপুর কেন্দ্রে অদিতি মুন্সি, চৌরঙ্গী কেন্দ্রে এগিয়ে তৃণমূলের প্রার্র্থী অভিনেত্রী নয়না মুখার্জি, বেহালা পশ্চিম কেন্দ্রে এগিয়ে তৃণমূলের রত্না চ্যাটার্জি, চন্ডীপুর কেন্দ্রে এগিয়ে তৃণমূলের সোহম চক্রবর্তী, বারাসতে অভিনেতা চিরঞ্জিত চক্রবর্তী, মেদিনীপুর কেন্দ্রে এগিয়ে তৃণমূল প্রার্থী অভিনেত্রী জুন মালিয়া। বাঁকুড়া কেন্দ্রে এগিয়ে তৃণমূলের প্রার্থী অভিনেত্রী সায়ন্তিকা ব্যানার্জি প্রমুখ। জয়ের পরই মমতা ব্যানার্জিকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং, অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন, সমাজবাদী পার্টি নেতা অখিলেশ যাদব, আপ নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল, ঝাড়খন্ড মুক্তি মোর্চা নেতা হেমন্ত সোরেন। ফল ঘোষণার পর বিকাল ৫টা নাগাদ বাড়ি থেকে বেরিয়ে দলীয় কর্মীদের উদ্দেশে বার্তা দেন মমতা। এই জয়কে বাংলার জয় বলে অভিহিত করে মমতা আরও বলেন, ‘আপনাদের সকলকে ধন্যবাদ। আপনারা অনেক খেটেছেন। আপনারা ভালো থাকুন, কভিডের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার কভিডের জন্য কাজ করা, আপনারা মাস্ক পরুন। করোনায় অনেক মানুষ আক্রান্ত, তাই বিজয় মিছিল এখন করা হবে না। এই জয় বাংলার জয়, বাংলাই পারে।’

অন্যদিকে বিজেপির হেভিওয়েট প্রার্থীদের মধ্যে কৃষ্ণনগর উত্তর কেন্দ্রে জয়ী হয়েছেন দলের সহ-সভাপতি মুকুল রায়, এই কেন্দ্রে পরাজিত হয়েছেন তৃণমূলের প্রার্থী অভিনেত্রী কৌশানি মুখার্জি। খড়গপুর কেন্দ্রে জয় পেয়েছেন বিজেপির প্রার্থী অভিনেতা হিরণ চ্যাটার্জি, তবে ভবানীপুর কেন্দ্রে পরাজিত হয়েছেন বিজেপি প্রার্থী অভিনেতা রুদ্রনীল ঘোষ। বেহালা পশ্চিম কেন্দ্রে পরাজিত হন বিজেপির পায়েল সরকার। বেহালা পূর্ব কেন্দ্রে পরাজিত বিজেপির অভিনেত্রী প্রার্থী শ্রাবন্তী চ্যাটার্জি, চন্ডীতলা কেন্দ্রে হেরেছেন বিজেপির যশ দাশগুপ্ত, বরানগর কেন্দ্রে পরাজিত হয়েছেন অভিনেত্রী পার্নো মিত্র, শ্যামপুরে পরাজিত বিজেপির তারকা প্রার্থী তনুশ্রী চক্রবর্তী, সিঙ্গুর থেকে হারলেন তৃণমূল থেকে বিজেপিতে যোগ দেওয়া মাস্টারমশাই বলে খ্যাত রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য। তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়া মন্ত্রী রাজীব ব্যানার্জি ডোমজুড় কেন্দ্রে পরাজিত হয়েছেন। তবে এবার মোট পাঁচ সাংসদকে বিধানসভার নির্বাচনে প্রার্থী করেছে বিজেপি। যার মধ্যে ছিলেন বাবুল সুপ্রিয়, লকেট চ্যাটার্জি, স্বপন দাশগুপ্ত, নিশীথ প্রামাণিক ও জগন্নাথ সরকার। বিজেপি ক্ষমতায় এলে মুখ্যমন্ত্রী পদের দাবিদারও ছিলেন তারা। কিন্তু তাদের তিনজনই নিজেদের কেন্দ্রে পরাজিত হয়েছেন। টালিগঞ্জ কেন্দ্রে পরাজয়ের মুখ দেখতে হয়েছে বিজেপি প্রার্থী বাবুল সুপ্রিয়কে। এ ছাড়াও চঁচুড়া কেন্দ্রে হেরেছেন বিজেপির প্রার্থী লকেট চ্যাটার্জি, তারকেশ্বর কেন্দ্রে পরাজিত হয়েছেন বিজেপির স্বপন দাশগুপ্ত। একমাত্র দিনহাটা কেন্দ্রে বিজেপি প্রার্থী নিশীথ প্রামাণিক তার নিকটতম প্রতিপক্ষ উদয়ন গুহর চেয়ে এগিয়ে আছেন। এদিকে তৃণমূলের এগিয়ে থাকার খবর আসতেই সকালে কালীঘাটে মমতা ব্যানার্জির বাড়ির সামনে ভিড় জমাতে শুরু করেন তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকরা। কালীঘাটে বাড়ির সামনে লাগানো হয় জায়ান্ট স্ক্রিন। সেখানেই ফলাফল দেখছেন ঘাসফুল শিবিরের কর্মী-সমর্থকরা। আর প্রতি মুহুর্তেই আবীর (রঙ) খেলায় মেতেছেন তৃণমূলের সমর্থকরা। এ ছাড়াও রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায়ও উৎসবে মেতেছেন তৃণমূল কর্মী-সমর্থকরা। উল্টোদিকে বেশ খানিকটা মনমরা ও হতাশ গেরুয়া শিবিরের নেতা-কর্মী-সমর্থকরা। কলকাতার হেস্টিংয়ের বিজেপির নির্বাচনী দফতরের সামনে সকাল থেকেই সুনসান চেহারা নেয়। কারণ নির্বাচনী প্রচারে এসে বিভিন্ন সময়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি থেকে শুরু করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বা সর্বভারতীয় সভাপতি জে পি নাড্ডা- প্রত্যেকেই দাবি করেছিলেন ২০০ এর বেশি আসন পেয়ে রাজ্যে সুরকার গড়তে চলেছে কিন্তু বেলা শেষে তিন অঙ্কের সংখ্যাতেই পৌঁছতে পারেনি মোদি-অমিত শাহর দল। এমনকি বাংলা দখলের লড়াইয়ে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে রাজ্যের শীর্ষ বিজেপি নেতারা দিন-রাত এক করে প্রচারণার ময়দানে পড়ে ছিলেন। তবু শেষ রক্ষা হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই তৃণমূলের জয়ের পরই দলের নেতা মমতা ব্যানার্জির কৃতিত্বকে স্বাগত জানিয়েছেন বিজেপির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক কৈলাশ বিজয়বর্গী। দলের এই ফলাফল নিয়ে বিশ্লেষণ করা হবে বলেও জানান তিনি।
অন্যদিকে দলের এই হতাশাজনক পারফরমেন্স স্বীকার করে নিয়েছেন দলের রাজ্য সহসভাপতি জয়প্রকাশ মজুমদার। এদিন বিকালে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি বলেন, ‘মমতা ব্যানার্জির সরকার তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় এসেছে, আমরা তাঁকে স্বাগত জানাচ্ছি। আমরা সর্বশক্তি দিয়ে লড়াই করেছিলাম, আমরা একটা মাইলস্টোনে পৌঁছতে পেরেছি সেটি হলো বিরোধী দলের মর্যাদা লাভ করেছি। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য ছিল রাজ্যে ক্ষমতায় আসা, কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে পারিনি। এই ত্রুটি আমাদের কারণ আমরা হয়তো মানুষের কাছে সেভাবে পৌঁছতে পারিনি। আমরা দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করব এবং সরকার যে পদক্ষেপ নেবে তা গ্রহণ করব।’